মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

উপজেলার ঐতিহ্য

নৈসর্গিক সৌন্দর্য অরন্যরানী ও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর সম্ভাবনাময়ী লামা

তবে ফি বছর বন্যা, পাহাড় ধস ও বন্যহাতির আক্রমণ উপজেলাবাসীর অভিশাপ

নয়ন জুড়ানো সবুজ স্নিগ্ধ বনানী ঘেরা নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর অরন্যরানী লামা। এখানে রয়েছে সর্পিল ঢেউ খেলানো অসংখ্য ছোট-বড় পাহাড় ও পাহাড়ের বুক চিড়ে বহমান নদী। মনোরম দৃশ্যের সমাহার ও বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারে সমৃদ্ধ লামা, ঠিক যেন শিল্পীর পটে আঁকা ছবির মত। সর্বত্র সবুজ-শ্যামল গিরি শ্রেনীর এক অপরূপ চিত্র বৈচিত্রময় হাতছানি। বাঙ্গালী ও উপজাতির মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন এ উপজেলার অন্যতম বৈশিষ্ঠ্য। ভৌগলিক অবস্থানগত দিক থেকে পাহাড় ও নদী বেষ্টিত হওয়ায় দেশের অন্যান্য জেলা উপজেলার চেয়ে পুরোপুরি বৈচিত্র্যময় বলা চলে। উপজেলার দক্ষণে- আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা, পশ্চিমে- কক্সবাজারের রামু ও চকরিয়া এবং চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা, উত্তরে- বান্দরবানের সুয়ালক ইউনিয়ন, পূর্বে- বান্দরবানের থানছি ও রম্নমা উপজেলা। ৬৭১.৮৪ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের মধ্যে নদী এলাকা ৭৮.১৭৩ বর্গ কিলোমিটার, সংরক্ষত বনভূমি ৩৩২.৮২৭ বর্গ কিলোমিটার ও চাষাবাদযোগ্য ভূমির আয়তন ২৬০.৮৪৫ বর্গ কিলোমিটার। বর্তমানে যার অধিকাংশই আবাদ করে গড়ে উঠেছে বসতি। উপজেলাটি ২১.৩৬ হতে ২১.৫৯ উত্তর আংশ এবং ৯২.০৪ হতে ৯২.২৩ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে ও সমুদ্র পৃষ্ট থেকে ২৯.৮৭ মিটার উপরে অবস্থিত। এখানকার পাহাড় সমুহের উচ্চতা ২ শ’ থেকে ৩ শ’ মিটার। এক সময়ের দুর্গম পাহাড়ি লামা বর্তমানে কোলাহলপূর্ণ বিকাশমান পর্যটন শহর। এখানের অপরম্নপ প্রাকৃতিক শোভা, বয়ে চলা পাহাড়ী আঁকা-বাঁকা মাতামুহুরী নদী, দুঃখি ও সyুখ পাহাড়ের উঁচু চুড়া, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের তীর্থমান হিসেবে পরিচিত সাবেক বিলছড়ি মহামুনি বৌদ্ধ বিহার ইত্যাদি দেশ-বিদেশের ভ্রমন বিলাসী পর্যটকদের সহজে আকৃষ্ট করে। তাছাড়া এ উপজেলায় বসবাসরত নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠির রয়েছে আলাদা ভাষা ও সংস্কৃতি। এদের অনেক রীতিনীতি কৃষি, সামাজিক জীবনাচার ও গৌরবময় সাংস্কতিক ঐতিহ্য বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে মহিমান্বিত এবং বৈচিত্র্যময় করেছে।

২০১১ সালের মার্চ মাসের আদমশুমারীর তথ্যমতে, উপজেলার মোট জনসংখ্যা ১ লাখ ১৩ হাজার ৪১৩ জন। তম্মধ্যে পুরম্নষ ৫৮ হাজার ৯০৪ জন, মহিলা ৫৪ হাজার ৫০৯ জন। আর পরিবার ২২ হাজার ৪৪৭টি। এখানে মোট ভোটার সংখ্যা ৫৮ হাজার ৫৩৭জন। এদের মধ্যে পুরম্নষ ভোটার ৩০ হাজার ৯১জন এবং মহিলা ভোটার ২৮ হাজার ৪৪৬জন। পার্বত্যাঞ্চলে ১৩টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপজাতিয় জনগোষ্টীর বসবাস থাকলে এ উপজেলায় এদের মধ্যে ৬ টি জনগোষ্ঠির বাস। এদের মধ্যে ১৪ হাজার ৪৮৫জন মার্মা, ৫হাজার ১৯২জন ত্রিপুরা, ৮ হাজার ৭৭০জন মুরম্নং, ৭৮জন চাকমা,  ১২৯জন তংচংগ্যা ও ২২১ জন খেয়াং সম্প্রদায় বসবাস করে। উলেস্নখ্য যে, ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বেশীর ভাগই খ্রীষ্ট ধর্ম গ্রহন করেছে। তবে তার সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ মাইলে ২৪৯ জন। উপজেলার শতকরা ৬৩.২৭ পরিবার কৃষি কাজের উপর নির্ভরশীল। শতকরা ৫.৮৪ ভাগ লোক পশুপালন ও মৎস্য শিকার কাজে নিয়োজিত। শতকরা ১৫.৫৪ ভাগ কৃষি কাজের মুজুর। অন্যান্য কাজে দিনমুজুর ৭.২৮ ভাগ। ব্যবসায়ী ৮.২৩ ভাগ এবং চাকুরীজীবি ৮.২৩ ভাগ। এ ছাড়াও উলেস্নখযোগ্য মানুষ স্থানীয় বনাঞ্চলের উপর নির্ভরশীল। বন হতে গাছ, বাঁশ ও পাহাড়ের পাদদেশ হতে পাথর এবং পাহাড়ী ছড়ার বালি সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। উপজেলায় খাদ্যের চাহিদা রয়েছে ১৫১৬১.০০ মে.টন। উৎপাদন হয় ১৪১০৫.০০ মে.টন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন,  পর্যটন, কৃষি, মৎস্য, হর্টিকালচার, গ্যাস, কয়লা, পাথর, বালু, ফলজ, বনজ ও রাবার শিল্পের অফুরমত্ম সম্ভাবনা রয়েছে এ উপজেলায়। উলেস্নখিত সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগাতে পারলে দেশে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানসহ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরম্নত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।  তবে ফি বছর পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যা, বন্যহাতির আক্রমণে প্রাণহানি এবং পাহাড় ধসে মানবিক বিপর্যয় এ উপজেলাবাসীর অভিশাপ হয়ে আছে।  এসব সমস্যা সমাধানে তিনি সংশিস্নষ্ট মন্ত্রণালযের হসত্মক্ষপ কামনা করেন।

১৯২০ সালের ৭ সেপ্টেম্বর লামা থানা গঠিত হয়। ১৯৭০ সালের ৯ অক্টোবর আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি, বাইশারী ও গজালিয়া থানাকে নিয়ে লামা মহকুমায় উন্নীত হলে পরিচিতি, খ্যাতি, উন্নয়ন দিন দিন বৃদ্দি পেতে থাকে। অত্যমত্ম দু:খের বিষয় যে, ১৯৮৩ সালে এরশাদ সরকার শাসনামলে প্রশাসন বিকেন্দ্রিকরণের আওতায় দেশের সকল মহকুমাকে বিলুপ্ত করে জেলা ঘোষণা করার সরকারী প্রজ্ঞাপনে লামাকে জেলা ঘোষণা করা হলেও একটি মহলের ষড়যন্ত্রের কারণে তা মাত্র ৩ দিন স্থায়ী হয়। পরে লামা জেলা উপজেলা পর্যায়ে একধাপ নেমে যায়। অপরদিকে, বাইশারী ও গজালিয়া থানা বিলুপ্ত হয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে রম্নপামত্মরিত হয়। এতে জনমনে ক্ষাভ ও হতাশার পাশাপাশি জনগন তাদের উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়। এখন লামাকে জেলা হিসেবে পেতে চায় উপজেলাবাসী। বর্তমানে এ উপজেলায় ১৮টি মৌজা, ৭টি ইউনিয়ন এবং ৪৪০টি পাড়া ও ৪৪০ জন কারবারী রয়েছে। এছাড়া উপজেলা পরিষদ ও ১টি পৌরসভা রয়েছে। ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত লামা পৌরসভার কার্যক্রম। বর্তমান পৌর মেয়র হচ্ছে মো. আমির হোসেন। এতে আরও ৯জন পুরম্নষ ও ৩জন মহিলা কাউন্সিলর রয়েছে। ১জন চেয়ারম্যান, ২জন ভাইস চেয়ারম্যান এবং ৭ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নিয়ে গঠিত হয় উপজেলা পরিষদ। বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান হলেন, মোহাম্মদ ইসমাইল। ভাইস চেয়ারম্যানগন হলেন মো. আইয়ুব আলী ও সেতারা আহমদ। বর্তমানে ১নং গজালিয়া ইউপি চেয়ারম্যান হলেন বাথোয়াইচিং মার্মা। ২নং লামা সদর ইউপি চেয়ারম্যান হলেন মিন্টু কুমার সেন। ৩নং ফাঁসিয়াখালী ইউপি চেয়ারম্যান হলেন জাকের হোসেন মজুমদার। ৪নং আজিজনগর ইউপি চেয়ারম্যান হলেন নাজমুল ইসলাম চৌধুরী। ৫নং সরই ইউপি চেয়ারম্যান ফরিদুল আলম। ৬নং রম্নপসীপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান সাচিংপ্রম্ন মার্মা ও ৭নং ফাইতং ইউপি চেয়ারম্যান হলেন সামছুল আলম।

সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী এম. রম্নহুল আমিন সম্পাদিত প্রেক্ষাপট; ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম অরন্য রানী লামা’ পুসত্মকে জানা যায়, ১৭শ শতাব্দীর শেষ দিকে আরাকান থেকে হ্লামা নামক এক সুন্দরী রমনী বিপুল ধন সম্পদ ও স্বর্ণালংকার নিয়ে মায়ানমারের আরকান রাজ্য থেকে কক্সবাজার, হারবাং ও মানিকপুর হয়ে লামায় আগমন করেন। তিনি সাবেক বিলছড়ি মহামনি বৌদ্ধ বিহার সংলগ্ন একটি পলস্নীতে বসতি শুরম্ন করেন। পরে তিনি পাশে একটি বৌদ্ধ বিহার নির্মাণ করেন। প্রবাদ আছে, তিনিই সর্ব প্রথম উপজাতিয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ১লা বৈশাখ তথা সাংগ্রাই উৎসবটি প্রবর্তন করেন। যা এখনো চলমান। সাংগ্রাই উৎসবে তিনি উপজাতিয় সম্প্রদায়কে আতিথিয়তায় মুগ্ধ করে তোলেন। অত্র অঞ্চলের উপজাতিয় জনগোষ্ঠি তার সুনাম, খ্যতি এবং আতিথিয়তায় মুগ্ধ হয়ে অত্র এলাকাটিকে হ্লা-মা নাম করণ করেন। উপজাতিয় ‘হ্লা-মা’ শব্দের অর্থ সুন্দরী নারী। আধুনিক সভ্যতার প্রেক্ষাপট হ্লামা থেকে ‘লামা‘ নামকরণ হয়। এ নামকরণ নিয়ে বিভিন্ন মহলের মধ্যে মতামত্মর ও মত বিরোধ রয়েছে। যাহা গবেষণার মাধ্যমে সু-স্পষ্ট করা দরকার। রাজধানী ঢাকা, বিভাগীয় শহর চট্টগ্রাম ও জেলা সদরের সাথে রয়েছে সড়ক যোগাযোগ। রাজধানী ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম থেকে চিরিঙ্গা, চিরিঙ্গা থেকে ফাঁসিয়াখালী হাঁসের দীঘি নামক স্থানে পূর্ব দিকের রাসত্মার ধরে লামায় প্রবেশ করতে হয়। উপজেলার সবক’টি ইউনিয়নের সাথে উপজেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ রয়েছে।

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, ১৫১৪ খ্রীষ্টাব্দে ত্রিপুরা রাজা ধন মানিক্য চট্টগ্রাম দখল পূর্বক পাশ্ববর্তী চকরিয়া পর্যমত্ম আধিপত্য বিসত্মার করেন। রাজা ধন মানিক্যের নামে চকরিয়ার একটি এলাকা নামকরন করা হয় মানিকপুর। এ মানিকপুরে অবস্থানরত চকরিয়া ও সাতকানিয়া এলাকার বাঙ্গালীসহ বিভিন্ন উপজাতি সম্প্রদায় মাতামুহুরী নদীর অববাহিকা দিয়ে লামায় প্রবেশ করে বসতি স্থাপন করে। এছাড়া অপর একাটি সূত্র থেকে জানা যায়, ইন্দো মঙ্গোলীয় মানব শাখার বংশোদ্ভূত নৃগোষ্টি গুলি আমাদের প্রতিবেশী মায়ানমারের আরাকান এবং ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে পার্বত্যাঞ্চলে প্রবেশ করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরম্ন করে। এরাই বর্তমানে চাক্মা, মার্মা প্রভৃতি নামে পরিচিত। পার্বত্যাঞ্চলে এদের আগমন ঘটলেও এসব নৃগোষ্ঠিগুলি কখন কিভাবে লামা এসেছিল তার কোন সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ধারনা করা হচ্ছে, লামার পাশ্ববর্তী আলীকদমের সাথে মায়ানমারের আরাকানের সীমামত্ম রয়েছে। সে সীমামত্ম দিয়ে জুমচাষ উপযোগী উর্বর পাহাড়ী ভূমির সন্ধানে আলীকদম হয়ে এখানে এসে বসতি গড়ে তোলেন। পরবর্তী পর্যায়ে লোকজন আসেত্ম আসেত্ম বৃদ্ধি পেতে থাকলে কক্সবাজারের চকরিয়া, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলা থেকে বাঙ্গালীরা বিভিন্ন ধরণের ব্যবসা করতে এসে এখানে স্থায়ী হয়। ক্রমশ জনবসতি বৃদ্ধি পেলে ঊনিশ শতকের শুরম্নর দিকে গজালিয়া, লামা ও আলীকদম নিয়ে থানা প্রতিষ্ঠা হলে এতদাঞ্চল প্রশাসvানক প্রক্রিয়ায়ার আওতায় আসে। ষাটের দশকে ভারত সরকার কর্তৃক বিতাড়িত হয়ে কিছু বাঙ্গালী পরিবার উপজেলার ফাঁসিয়াখালী, আজিজনগর ও ফাইতংসহ সদর এলাকায় এসে বসতি শুরম্ন করেন। এরপর কাপ্তাই বাঁধের কারণে কিছু লোকজন উচ্ছেদ হয়ে লামামুখ এলাকায় এসে পুণবার্সিত হন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২-৭৩ সালের দিকে কুমিলস্না, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার কিছু ভূমিহীন লোক এখানে বনজ দ্রব্য আহরণ করতে এসে এলাকার প্রতি মুগ্ধ হয়ে স্থায়ীভাবে বসতি শুরম্ন করে। ১৯৭৯-৮০ সালের দিকে মরহুম রাষ্টপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে নদী ভাঙ্গা গৃহহীন ও দরিদ্র ভাসমান প্রায় ৫হাজার পরিবারকে এখানে প্রথম পর্যায়ে পুনর্বাসিত করেন। এ সুযোগে আরও প্রায় ২ হাজার পরিবার নিজ উদ্যোগে তাদের আত্নীয় স্বজনের সহযোগিতায় পুনর্বাসিত হয়। সে থেকে দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে এখানের জনসংখ্যা। একই সাথে লামার শিক্ষা, সংস্কৃতি, যোগাযোগসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ড বৃদ্ধি পাওয়ায় লামার পরিচিতি সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৭১ সালে দেশের মানুষ যখন পাকিসত্মানীদের শাসন শোষনের হাত থেকে বাঁচার জন্য যুদ্ধে নামেন; তখন লামার মানুষও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ও শহীদ জিয়াউর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। তৎসময়ে চাম্পাতলীর বর্তমান পরিত্যাক্ত লামা থানা পাকিসত্মানী হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প ছিল। লামাবাসী এটিকে উড়িয়ে দিয়ে লামাকে হানাদারমুক্ত করলেও শহীদ আবদুল হামিদকে নিয়ে যায় পাকিসত্মানিরা। মেজর জামানের নেতৃত্বে তারা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হামিদকে কক্সবাজার ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন করেন। এরপর উখিয়া থানার হ্নীলায় নিয়ে তাকে বর্বর নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে। এসময় শহীদ আবদুল হামিদ মৃত্যুর পূর্বে হানাদার বাহিনীকে অনুরোধ করেন, তাকে যেন চকরিয়াস্থ শাহ ওমরাবাদ মাজারে কবরস্থ করেন।

মাতামুহুরী নদী পথেই লামার সাথে দেশের অন্যান্য এলাকাবাসীর প্রথম যোগাযোগের সূচনা হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে মরহুম জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ১৬ ইসিবি গঠন করে লামা আলীকদম ও ফাঁসিয়াখালী সড়কের নির্মান কাজ শুরম্ন করেন। তখন প্রথম অধিনায়ক ছিলেন বর্তমান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক সেনা প্রধান লে. জেনারেল মাহাবুবুর রহমান। ১৯৮৭ সালে সড়কের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। পরবর্তীতে সাবেক রাষ্টপতি হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ আলীকদমে এক জনসভার মাধ্যমে সড়কের শুভ উদ্ভোধন করেন। এখানে উলেস্নখ যে, ১৯৭৯ সালের ৯ আগস্ট শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান লামায় আগমন করে এক জনসভা শেষে টি.টি এন্ড ডিসিস্থ লামা জেলা রেষ্ট হাউসে রাত্রী যাপন করেছিলেন। তিনি লামা থানাকে বিভিন্ন সমস্যা দূরীকরণের জন্য জরম্নরী ভিত্তিতে লামা-আলীকদম সড়ক দ্রম্নত নির্মান, বিদ্যুতায়ন, হাসপাতাল, মহকুমা কমপেস্নক্স, হাই স্কুল সরকারী করণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডের ঘোষণা দেন। তারপর থেকে সার্বিক উন্নয়ন কর্মকান্ডের সাথে সাথে এলাকাবাসীর জীবনযাপনের মান ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। এরপর এরশাদ সরকারের আমলে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য আজিজনগর-গজালিয়া, গজালিয়া-লামা ও ফাইতং-লামা সড়ক নির্মাণ করা শুরম্ন করা হলেও এখনো শেষ হয়নি। এর পাশাপাশি ১৯৯১সালে বিএনপি সরকারের আমলে লামা-সুয়ালক সড়কটি এলজিইডির মাধ্যমে নির্মিত হয়। যাহা এখনো অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বর্তমানে উপজেলায় ৩৬২ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে কার্পেটিং ৫১ কিঃ মিটার, এইচবিবি ৬৮ কিঃ মিটার ও কাঁচা ২৪৩ কিঃ মিটার।

লামায় ৩টি ডাকঘর, ১টি থানা, ১টি টেলিগ্রাম অফিস, ১টি কুটির শিল্প, ৫টি পুলিশ ফাঁড়ি, ১টি বিজিবি ক্যাম্প, ১টি ফায়ার সার্ভিস, ১টি আনসার ব্যাটালিয়ন ক্যাম্প, ১টি ডিগ্রি কলেজ, ১টি ফাজিল (ডিগ্রী) মাদ্রাসা, ২টি খাদ্যগুদাম, ১টি বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয়, ১টি সড়ক ও জনপথ বিভাগ কার্যালয়, ৫টি বিভিন্ন ব্যাংকের শাখা, ১টি সংরক্ষত বনাঞ্চল, ১টি নদী, ৭টি খাল, ৭টি হাট বাজার, ১টি ৫০ শয্যা সরকারী স্বাস্থ্য কমপেস্নক্স, ১টি সহকারী পুলিশ সুপারের কার্যালয়, ২টি শিল্প কারখানা, ১টি পশু চিকিৎসালয়, ১টি সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত, ৪টি টোব্যাকো কোম্পানীর এরিয়া অফিস, ৩টি মোবাইল নেটওয়ার্ক কোম্পানী, ১টি উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয়, ১টি প্রাথমিক শিক্ষা অফিস, ১টি রিসোর্স সেন্টার, ১টি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, ১টি জেলা তথ্য অফিস, ১টি ভূমি অফিস, ৬টি পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, ৩টি স্বাস্থ্য কেন্দ্র, ১০টি ক্লিনিক, ২১০টি সরকারী, বেসরকারী ও কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৮টি জুনিয়র স্কুল, ৩টি হাই স্কুল এবং ৩৬টি দাখিল, এবতেদায়ী ও নুরানী মাদ্রাসা, ১৮২টি মসজিদ, ৪১টিকেয়াং, ৬টি মন্দির, ৩৭টি গীর্জা, ১টি উপজেলা হিসাব রক্ষণ অফিস, ১টি উপজেলা বিআরডিবি অফিস, ১টি যুব উন্নয়ন অফিস, ১টি উপজেলা সমাজ সেবা অফিস, ১টি শহর সমাজ সেবা, ১টি উপজেলা পরিবার পরিকল্পন অফিস, ১টি মৎস্য অফিস, ১টি মহিলা বিষয়ক অফিস, ১টি কৃষি অফিস, ১টি আনসার ও ভিডিপি অফিস, ১টি উপজেলা সমবায় অফিস, ১টি পরিসংখ্যান অফিস, ১টি মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, ১টি নির্বাচন অফিস, ৪টি আশ্রয়ন প্রকল্প, ১টি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন অফিস, ১টি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ১টি পেট্রোল পাম্প, ৫৫৫টি পাওয়ার পাম্প, ১ হাজার ৮৮৩টি বসতঘর, ২৫৯টি গ্রাম, এনজিও স্কুল ৪৪০টি, কিন্ডার গার্টেন ৩টি, সিনেমা হল ২টি, সমবায় সমিতি ১৮৩টি, গ্রামীন ব্যাংক২টি, ৬টি বীমা কোম্পানী, ১টি প্রেস ক্লাব ও ১টি রিপোর্টার্স ক্লাব রয়েছে।

এখানে এনজিও‘র মধ্যে স্থানীয় এন.জেড একতা মহিলা সমিতি, গ্রাউস, ব্র্যাক, কারিতাস, আইডিএফ, আশা, স্পেস, তৈমু, বাপ্সা ও পদক্ষপ এর কার্যক্রম রয়েছে। এছাড়া ইউএনডিপি, সিএইটিডিএফ ও কনসার্ন ইউনিভার্সেল এর কার্যক্রম চলছে।

এ উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষার জরিফে ৬-১০ বছর বয়সী ২৫ হাজার ৮৩৯ জন শিশু রয়েছে। এর মধ্যে ভর্তিকৃত শিশু হচ্ছে ২৫ হাজার ৪৫৯ জন। অভর্তিকৃত শিশুর সংখ্যা ৬-১০ ৩৮০ জন। ভর্তিযোগ্য ৬-১০ বছর বয়সী ১৩৮ জন। বাকীগুলো অযোগ্য। অর্থাৎ এরা সকলেই শারিরীক, মানসিক প্রতিবন্ধি। বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ৯৯%। ঝরেপড়া ২৫.৫০%। উপজেলায় শিক্ষতের হার ৩০%।

লামায় প্রতিটি ২৫ একর করে ১৫শটি রাবার বাগান ও সাড়ে ৭শ বিভিন্ন ফলফলাদির হর্টিকালচার বাগান রয়েছে। এসব রাবার বাগান থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমান রাবার উৎপন্ন হয়। যাহা জাতীয় রাজস্ব আয়ে ব্যাপক অবদান রাখছে। এটিকে নিয়ে রাবার শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব।  এছাড়া এখানের পাহাড়গুলোতে বিপুল পরিমাণ উন্নত মানের খনিজ পাথর ও বালু সম্পদ রয়েছে। যা দিয়ে সিমেন্ট কারখানাসহ সিরামিক শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। ফাঁসিয়াখালীর ইয়াংছা এলাকার মিজ্ঝিরিতে গ্যাস ও রম্নপসীপাড়ায় কয়লার খনি আছে। যা দিয়ে কয়লা ও গ্যাস উত্তোলন সম্ভব। এখানে রয়েছে অসংখ্য পাহাড় ও ঝিরি। এসব এলাকায় দুই পাহাড় ও ঝিরিতে কৃত্রিম জলাশয় সৃষ্টির মাধ্যমে ব্যাপক মৎস্য চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। যা দ্বারা দেশে আমিষ সংকট নিরসন সম্ভব। তাছাড়াও এখানের পতিত পাহাড়ী ভূমি রয়েছে। এসব পতিত পাহাড়ি ভূমিতে প্রাকৃতিক জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণের রয়েছে বিপুল সমাভবনা। পাহাড়ে হাজার হাজার একর ভূমি জুড়ে প্রাকৃতিকভাবে রয়েছে বাঁশ, বেত ও বৃক্ষ। এসব বনজ সম্পদ দিয়ে স্থানীয়ভাবে কাগজ ও ফানির্চার শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। এখানে আখ, ভূট্টা, কাসাপা, পাম অয়েল, কপি, কমলা ও চা চাষের জন্য এখানের পাহাড়ি মাটি ও জলবায়ু খুবই উপযোগী। এসব উৎপাদনের মাধ্যমে লামায় শিল্প কারখানা গড়ে উঠার সম্ভাবনা থাকলেও সরকারের পৃষ্টপোষকতার অভাবে তা হয়ে উঠেনি। এতদাঞ্চলে উৎপাদিত  মৌসুমী ফল, আদা, হলুদ, রাবার, বাঁশ ও কাঠ কেন্দ্রীক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে এখানকার উৎপাদিত পন্য যেমন কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারত; তেমনি এলাকার হাজার হাজার শ্রমজীবি মানুষের কর্মসংস্থানের সংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরম্নত্বপূর্ণ ভুমিকা রখতে সক্ষম হত। দেশের একটি অর্থকারী ফসল তামাক। উপজেলায় রবি মৌসুমে প্রচুর পরিমানে তামাক চাষ হয়। শতকরা ৮০ জন চাষী তামাক চাষ করে থাকেন। এখানে উৎপাদিত তামাক দিয়ে এলাকায় একটি তামাক শিল্প গড়ে উঠা সম্ভব। অপরদিকে লামার পাহাড় ও নদী ঘেরা প্রাকৃতিক দৃশ্যে  রয়েছে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা। এখানকার প্রাকৃতিক নৈসর্গিক দৃশ্য এবং উপজাতীয় জনগোষ্টির জীবনধারাকে পূঁজি করে এখানে পর্যটন শিল্প গড়ে উঠতে পারে। এর মাধ্যমে পাহাড়ী জনপদ লামার পরিচয় ছড়িয়ে পড়তে পারে দেশে থেকে বিদেশে। বর্তমানে লামার মিরিঞ্জা পর্যটন এলাকা, সাবক বিলছড়ি মহামুনি বৌদ্ধ বিহার, সরই এলাকার কোয়ান্টাম শিশু কানন এবং পাহাড়ের গা দিয়ে বয়ে যাওয়া মাতামুহুরী নদীর সৌন্দর্য আগমত্মকদের মুগ্ধ করে। সরকারি সহযোগিতায় এসকল পর্যটন এলাকাগুলো আধুনিকায়ন করা হলে তা নিশ্চিত এতদাঞ্চলের পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটাবে।

লামায় অবস্থিত সবুজ শ্যামল পাহাড়গুলো এক শ্রেনীর লোভী মানুষের নির্মমতার শিকার হচ্ছে দিনের পর দিন। এসব পাহাড় থেকে নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন, যুগ যুগ ধরে পাথরের বেষ্টুনি দিয়ে গড়ে উঠা পাহাড়গুলো থেকে  অপরিকল্পিতভাবে পাথর আহরণ এবং জুম চাষের বিরম্নপ প্রভাবে দেখা দিয়েছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়। স্থানীয় মাতামুহুরী নদী গত এক দশকে অস্বাভাবিভাবে নব্যতা হারিয়েছে। ফলশ্রতিতে সামান্য বৃষ্টি হলে দু’কুল ফেফে উঠে লামা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা সমুহে পাহাড়ী ঢলে বন্যার সৃষ্টি হয়। এর ফলে সরকারী বেসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কোটি কোটি টাকার ক্ষতিসাধিত হয়। একই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারনে প্রতিবছর অসংখ্য পাহাড় ধসে ব্যাপক জানমালের ক্ষতিসাধিত হচ্ছে। এছাড়া লামায় বন্য হাতি প্রকাশ্য ঘাতক হিসেবে রূপ ধারন করেছে। হাতির আক্রমনে প্রতিবছর  শিশু, মহিলাসহ অসংখ্য লোক প্রাণ হারাচ্ছে। আহত হচ্ছে শত শত লোক। ক্ষতি হচ্ছে ব্যাপক আবাদি ফসলের। হাতির ভয়ে চাষাবাদ করা সম্ভব হচ্ছেনা শত শত একর জমিতে। হাতির আক্রমন থেকে এলাকার জান ও মাল রক্ষার জন্য একটি অভয়ারন্য সৃষ্টির কার্যক্রম শুরম্ন হলেও দীর্ঘ বছর ধরে তা ফাইল চাপায় পড়ে আছে।

লামা উপজেলার প্রথম উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন মরহুম আলহাজ্ব মো. আলী মিয়া। তার আমলেই লামা ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকান্ডসহ দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করে। এক কথায় বলা চলে, তিনি এ উপজেলার প্রতিষ্ঠাতা ও উন্নয়নের রম্নপকার। প্রথম ইউপি চেয়ারম্যান ছিলেন প্রয়াত ম্রাথোয়াই অং চৌধুরী। তিনি গজালিয়া ইউনিয়নের দীর্ঘ ৪০ বছর বিনা প্রতিদ্বন্ধি চেয়ারম্যান ছিলেন। উপজেলার উন্নয়ন ও পরিচিতি লাভে তারও অবদান অবিস্মরনীয়। এছাড়া হাজ্বী বদরম্নদ্দৌজা চৌধুরী, আবদুল মালেক চৌধুরী, নুর মোহাম্মদ চৌধুরী, আজিজুর রহমান, সাবেক জেলা পরিষদ সদস্য ও ফাঁসিয়াখালী ইউপি চেয়ারম্যান আমির হোসেন মজুমদার, রম্নপসীপাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান চাহ্লাখইন মার্মা, সাবেক লামা ইউপি চেয়ারম্যান ও বর্তমান লামা পৌর মেয়র আমির হোসেন, সাবেক লামা ইউনিয়নের প্রথম চেয়ারম্যান থোয়াইহ্লাখই মার্মা ও সাবেক লামা ইউপি চেয়ারম্যান ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইসমাইল উপজেলার উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রেখেছেন। 

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত উপজাতিয়রা শায়ত্ব শাসনের দাবীতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি গঠন করে। তাদের এ সশস্ত্র সংগঠন ‘শামিত্মবাহিনী‘ বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামে শুরম্ন করে আন্দোলন। অশামত্ম হয়ে পার্বত্যাঞ্চল। শুরম্ন হয় বাঙ্গালীদের বিতাড়নের জন্য নির্যাতন ও  হত্যাকান্ড। ‘শামিত্মবাহিনী’র বর্বরোচিত তৎতপরতা ও হত্যাকান্ডের স্বীকার হয় সর্বপ্রথম ৩০০নং বড় বমু মৌজার বড় পাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাষ্টার মিনতি বড়ুয়াসহ ৭ জন। এর কয়েক দিন পর একই এলাকায় তৎকালীন গজালিয়া থানার সাব ইন্সপেক্টর আবদুল বাতেনসহ আরও ২পুলিশ সদস্য। এখনো গজালিয়ায় আবদুল বাতেন নামে একটি টিলা স্মৃতি বহন করে। ১৯৮৪-৮৫ সালে শামিত্মবাহিনীর হত্যাকান্ডসহ অত্যাচার দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী স্থানীয় বাঙ্গালীদের রক্ষার জন্য একটি ‘‘মুরম্নং বাহিনী’’ গঠন করেন। লামায় প্রথমে লাংরি মুরম্নং এর নেতৃত্বে উপজাতিয় ‘মুরম্নং বাহিনী’ গঠন করে ‘শামিত্ম বাহিনী’র অত্যাচার প্রতিহত করার তৎপরতা শুরম্ন করা হয়। এছাড়াও ‘শামিত্ম বাহিনী’র হত্যাকান্ডের মধ্যে উলেস্নখযোগ্য হচ্ছে- মেরাখোলা এক রাতে ৭জনকে গুলি করে হত্যা ও একই সময় ১৮ জনকে গুলি করে গুরম্নতর আহত করা। ছোট বমু নিথোয়াই হেডম্যানসহ ২ জনকে হত্যা,  ইয়াংছায় ৪ সেনাবাহিনী হত্যা, শীলেরতুয়ায় ৩জন, রম্নপসীপাড়ায় ২জন, লামামুখসহ বিভিন্ন স্থানে প্রায় ২শতাধিক লোককে নির্মমভাবে হত্যা করে তৎকালীন ‘শামিত্মবাহিনী’র সদস্যরা। শুধু শামিত্মবাহিনী নয়, ওই সময় এখানের মানুষকে ম্যালেরিয়া রোগের সাথেও যুদ্ধ করতে হয়েছে। তখন এ রোগে আক্রামত্ম হয়েও অগনিত মানুষ মারা যায়।

বান্দরবান জেলার এক তৃতিয়াংশ লোক এ উপজেলায় বসবাস। এ কারনে জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে লামা উপজেলা গুরম্নত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এককালে বিএনপি’র দুর্গ হিসেবে খ্যাত ছিল এ উপজেলা। গত সংসদ নির্বাচন থেকে পাল্টে গেছে এ হিসাব নিকাশ। বিএনপি’র দুর্গে গত সংসদ নির্বাচনে হানা দিয়ে দখল করে আওয়ামীলীগ। জেলা বিএনপি’র দন্ধের প্রভাবে উপজেলা বিএনপির দূ’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ায় দলের বড় একটি অংশ মূল দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এ কারনে উপজেলা বিএনপি তার অতীত গৌরব হারিয়েছে বলে রাজনৈতিক বোদ্ধারা মনে করছেন। চারদলীয় জোটের অন্যতম শরীকদল জামায়াতের সঙ্গে এখানে বিএনপি’র তেমন সম্পর্ক নেই বললেই চলে। কখনো জাতীয় কর্মসূচী কিংবা স্থানীয় কর্মসূচীতে তাদেরকে একত্রে অংশ গ্রহন করতে দেখা যায়নি। যুদ্ধাপরাধের বিচারের কারনে বলতে গেলে; জামায়াত আওয়ামীলীগের লেজুড় ভিত্তিতে কোন ধরনের কর্মসূচী পালন ছাড়াই অনেকটা নিস্কৃয় হয়ে রয়েছে। এছাড়া উপজেলায় দু’একজন জাতীয় পার্টির সমর্থকের দেখা মিললেও নেই কোন সাংগঠনিক কার্যক্রম। সব মিলিয়ে উপজেলায় আওয়ামীলীগ অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। বিএনপিতে এ উপজেলায় নেতৃত্বে রয়েছেন পৌর মেয়র আমির হোসেন, থোয়াইনু অং চৌধুরী ও এম রম্নহুল আমিন। পৌসভার নেতৃত্ব দিচ্ছেন আবদুর রব, গোলাম ছরোয়ার ও এম.দিদারম্নল ইসলাম।  ক্ষমতাসীন দল আওযামীলীগের এ উপজেলায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইসমাইল, বাথোয়াইচিং মার্মা ও জহিরম্নল ইসলাম। পৌরসভা পর্যায়ে মোহাম্মদ রফিক, তাজুল ইসলাম ও বশিরম্নল আলম। জামায়াতের নেতৃত্বে রয়েছে অধ্যাপক আবদুল মোনায়েম, ফারম্নক আহমদ ও এম ফরহাদ হোসেন প্রমুখ ।  

দেশ ব্যাপী যখন আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে; তখন দেশের অন্যান্য স্থানের তুলনায় এ উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অত্যমত্ম সমেত্মাষজনক। বর্তমানে তিন পার্বত্য জেলায় বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নতাবাদী বিভিন্ন গোষ্ঠীর সন্ত্রাসী কর্মকান্ড থাকলেও তা থেকে লামা উপজেলা সম্পূর্ন মূক্ত। এখানে দু’একটি ছোট খাটো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া বড় ধরনের আইন শৃঙ্খলা অবনতিমূলক তেমন কর্মকান্ড নেই বললেই চলে।

ছবি