মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব

ভূমিকা :

মরহুম আলহাজ্ব মোহাম্মদ আলী মিয়া ১৯৩০ সালে নোয়াখালী জেলার অমত্মর্গত রামগঞ্জ উপজেলার দেবনগর গ্রামে এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মোহাম্মদ আনছার আলী খন্দকার। মাতার নাম ফুলবানু। দুই ভাইবোনের মধ্যে আলী মিয়া ছিল সবার বড়।

 

বাল্যজীবন :

প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও রিক্ত হস্তে আনছার আলী তার ছেলে আলী মিয়াকে সাধারণ আক্ষরিক জ্ঞানটি দিতে পারেননি। ৮/৯ বছরের কিশোর আলী পরিবারের সীমাহীন অভাবের তাড়নায় দরিদ্র নিপীড়িত মাতাপিতাকে সাহায্য করার মানসে অনাথ ভাইবোনদের ও নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে, অনাহার ক্লিষ্ট  ছোট ভাই বোনদের মুখে হাসি ফুটানোর দূর্বার আগ্রহে গ্রামের অবস্থাপন্ন কৃষকদের ধান ও পাট ক্ষেতে আগাছা নিড়ানোর কাজ নিলেন। আরম্ভ করলেন শ্রম বিনিময়। এ কাজের জন্য শিশু শ্রমিক আলী গ্রামে তার মৃত গরীব পরিবারের সমবয়সী ১৪/১৫ জন কিশোর ও বালকদের নিয়ে একটি দল গঠন করলেন। ঐ শ্রমিক সংগঠনের সর্দার হিসেবে আলী মিয়া তাদের পরিচালনা করলেন। তিনি কাজের শেষে ক্ষেত মালিকদের নিকট হতে পারিশ্রমিক আদায় করে দলের শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ এবং দলের সকল প্রকার বিবাদ মীমাংসা করে দিতেন। এখান থেকেই আলী মিয়ার জীবনের পরবর্তী কালের গণ-মানুষের নেতৃত্ব দানের অভিলাষ, ব্যক্তিত্ব, প্রতিভা বিকাশের প্রথম প্রকাশ।

 

ভারত গমন :

কয়েক বৎসরের অক্লান্ত পরিশ্রমের পরও যখন কোন ফলোদয় হলোনা তখন ১০/১২ বছরের বালক আলী অত্যন্ত মর্মাহত হয়ে দুঃখী বাবা মায়ের দুঃখ মোচনের অদম্য অভিলাষে জন্মভূমির মায়া ত্যাগ করে পাড়ি জমালেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রতিবেশী দেশ ভারতের মাটিতে। আলী মিয়া ভারতের বেলুনিয়া মহকুমাকে ভাগ্য পট পরিবর্তনের স্থান নির্ধারণ করলেন। তিনি সেখানে ধলু বেপারীর বাড়ীতে মাসিক তিন টাকা বেতনে ৬ মাসের চুক্তিতে ৮০ টি গরম্ন চরানোর জন্য রাখালের চাকুরী ঠিক করলেন। ভারতের মাটিতে যখন আলীর অবস্থান করেছিলো ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য ঠিক সেই মহুর্তে আলীর ভাগ্যকাশে উদয় হলো আবদুল গফুর নামের একজন ব্যক্তি।

          ইতিমধ্যে সেখানে আলীর জীবনে এলো আরো এক চরম আঘাত। ভারতীয় শাসক গোষ্ঠীর মুসলিম খেদাও আন্দোলনে ১৯৬১ সালে ৭০ হাজার মুসলমান তদানীমত্মন পূর্ব পাকিস্তানের সিলেট ও কুমিলস্না জেলায় জোর পূর্বক পার করে দেয়। আলী মিয়াও উক্ত সময়ে ভারত থেকে চলে আসতে বাধ্য হয়। হতভাগ্য আলী ও তার বন্ধু গফুর আবারও সর্বশ্বান্ত হয়ে পাকিস্থানী উদ্বাস্থু শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করে। তখন তার পকেটে ছিল ৫ টাকা সম্বল।

ভারত থেকে বাংলাদেশ গমণ :

তিনি পরিবার পরিজন সহ ২/৩ বেলা উপোষ করে গভীর অরণ্যে ঘেরা জনপদে রামগড় থানায় এসে পৌঁছলেন। সেখানে ছক্কু মিয়া নামক এক হোটেল ম্যানেজার দয়াপরবশ হয়ে বিনা পয়সায় আলী মিয়ার পরিবারকে এক বেলা অন্নের ব্যবস্থা করে দিলেন। আলীর বন্ধু গফুর রয়ে গেলেন রামগড়ে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে আলী মিয়া :

আলীর গল্পময় জীবনের বহস্যময় ও বৈচিত্রময় দ্বিতীয় অধ্যায় পার্বত্য চট্টগ্রামের রামগড় আগমের পর শুরম্ন হয়। দু’মুঠো অন্নের জন্য আলী ও এ বাড়ী থেকে ও বাড়ী ঘুরতে লাগলেন। রামগড়ের মগ, ত্রিপুরা ও অন্যান্য উপজাতীয় পাড়ায় আলী মিয়া তাদের দুয়ারে আশার আলো খুঁজতে লাগলেন। এ সময়ে তিনি বাধ্য হয়ে ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে কোন রকমে নিজের ও পরিবারের জীবন রক্ষার জন্য সংগ্রাম করতে লাগলেন।

১৯৬২ সালের শেষের দিকে রামগড় মহকুমা প্রশাসক আলীর নেতৃত্বে দুইশত পরিবারকে লামা থানাধীন ফাঁসিয়াখালী মৌজায় প্রেরণ করার জন্য সিদ্ধামত্ম নিলেন।

          নেতৃত্ব পিপাসু আলী মিয়া ফাঁসিয়াখালী মৌজার পদার্পন করলেন দু’শত পুনর্বাসিত পরিবার নিয়ে। তার দলে প্রায় ২২ শ লোক ছিলো।

লামা আগমন :

রামগড় থেকে আলী মিয়া ২শ পরিবার রিপুজি নিয়ে লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী মৌজায় আসেন। সেখানে পরিবেশ পরিস্থিতি দেখে আলীর মনে উদয় হলো যেন পৃথিবী সৃষ্টির আদি হতে অদ্যাবধি আলীরাই এখানে প্রথম এসেছে। এদিকে সে দিকে সেখানের চারিধারে সন্ধান করে কিছু আদি বাসিন্দা উপজাতি খোঁজ পেল আলী মিয়া। ফাঁসিয়াখালী তখন হিংস্র বন্য হাতি, বাঘ, ভাল্লুক আর বিষধর স্বর্পের দখলে। তখন চকরিয়া থানার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের ৮/৯ টি মুসলিম পরিবার ও কয়েকটি খামার ব্যতিত সেখানে কোন জঙ্গল ঝিঁ ঝিঁর ডাক আর নাম না জানা পশু পাখির অদ্ভুদ চিৎকার ব্যতিত অন্য কোন সাড়া শব্দের বালাই ছিলনা। সুন্দর ভারত থেকে এসে পশুর হাতে ১৮জন মানুষ প্রাণ দিতে হলো। ১৩ টি পরিবার নিয়ে আলী মিয়া অত্যন্ত দুঃসাহসিকতার সাথে হিংস্র বন্য ও জমত্মু জানোয়ারের ছোবল অগ্রাহ্য করে বাদবাদী সকলে পালিয়ে গেল গহীন বনের মৃত্যু গুহা থেকে।

আলীর সমাজ সেবা ও জন প্রতিনিধিত্ব :

১৯৬২ সালে আলী মিয়া উপজাতি অউপজাতীয়দের বিপুল সমর্থনে লামা ইউনিয়ন কাউন্সিলে বিনা প্রতিদ্বন্ধীতায় সদস্য পদ লাভ করেন। মেম্বার আলী মিয়ার জানা আছে যে, জনসেবা করতে হলে প্রথমে নিজেকে হতে হবে স্বচ্ছল। অভাবগ্রস্থ লোকের পক্ষে জনসেবা করা খুবই দূরূহ এবং কঠিন ব্যাপার। চাষাবাদ করে যে সামান্য অর্থ অর্জিত হয়েছিল সেই মূলধন বিনিয়োগ করে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ছোট খাট ব্যবসা আরম্ভ করেন। বাগানের ফল, জমির ফসল এবং ব্যবসার সামান্য আয় দিয়ে মোটামুটি ভাবে ভালই চলছিল আলী মিয়া মেম্বারের সংসার। ১৯৭৩-৭৪ সালে স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের প্রথম ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে লামা ইউনিয়ন পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেন।

উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে আলী মিয়া :

১৯৮৫ সালে সরকার স্থানীয় সরকার পদ্ধতিতে জনগনের মনোনীত প্রতিনিধিদের উপর দায়িত্ব হমত্মামত্মর করে প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণকে সফল করার উদ্যোগ নিলে সঙ্গত কারণেই আলী মিয়াকে নির্বাচনে দাঁড়ানোর জন্যে জনগণ মনোনীত করে।

ছবি


সংযুক্তি